অ্যাকুয়াপনিক্সঃ একটি মাটিবিহীন মাছ ও সবজি চাষ ব্যবস্থা

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বেঁচে থাকার তাগিদে প্রতিনিয়ত হ্রাস পাচ্ছে আবাদি জমির পরিমাণ। ভরাট হচ্ছে পুকুর নদী-নালা ও জলাশয়। ব্যহত হচ্ছে ফসল উৎপাদন ও মাছ চাষ। প্রাণিজ আমিষের ঘাটতি পূরণে দেখা দিচ্ছে নতুন চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি পরিবেশ দূষণ ও নিরাপদ পানির অভাবে মাছচাষ ও ফসলের উৎপাদন যখন কাঙ্ক্ষিতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে না তখন ই বিকল্প পদ্ধতিতে মাছ চাষ ও ফসল উৎপাদন জরুরী হয়ে পরেছে। অ্যাকুয়াপনিক্স এমন ই একটি বিকল্প ব্যবস্থা যা মাছ চাষ ও ফসল উৎপাদন কে আরেক ধাপ এগিয়ে নিতে পারে এবং একইসাথে পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করে।

অ্যাকুয়াপনিক্স একটি সমন্বিত মৎস ও শাকসবজি চাষ ব্যবস্থাপনা যেখানে মাটি ছাড়া ই উৎপাদন সম্ভব। অ্যাকোয়াকালচার ও হাইড্রোপনিক্স এর মিশ্র ব্যবস্থা এই অ্যাকুয়াপনিক্স। অ্যাকুয়াপনিক্স মূলত এক ধরনের খাদ্য শস্য উৎপাদন প্রক্রিয়া যেখানে পানিতে জলজ উদ্ভিদ ও মাছ চাষ একই সাথে হয়ে থাকে। পানির উৎস হতে পারে কোনো কৃত্রিম জলাধার, বড় চৌবাচ্চা, বড় পাইপ ইত্যাদি। এটি একটি আবদ্ধ স্বাদু পানির কৃষি ব্যবস্থা।

যেখানে পানির প্রাচুর্য খুব স্বল্প পরিমাণে অ্যাকুয়াপনিক্স পদ্ধতি সেখানে খুবই উপযোগী। কেননা জানলে অবাক হবেন যে অ্যাকুয়াপনিক্স পদ্ধতিতে চাষ করলে প্রথাগত কৃষি ব্যবস্থার চেয়ে ৯০ শতাংশ কম পানির প্রয়োজন পড়ে। পাশাপাশি অ্যাকুয়াপনিক্স অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক এবং এতে কৃষি ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ সফলতার মূখ দেখা যাবে। আমাদের দেশও এখন এমন অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে অ্যাকুয়াপনিক্স পদ্ধতিতে খুব সহজেই চাষ করা যায়।
দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করে তুলতে পারে এই নতুন পদ্ধতির চাষ, শুধুমাত্র প্রয়োজন সরকারী ও বেসরকারীভাবে উদ্যোগ নিয়ে তা তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়া।

অ্যাকুয়াপনিক্স পদ্ধতির প্রসার ঘটিয়ে দেশে প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরনে ভূমিকা রাখা ও কোনো প্রকার বিষক্রিয়ামুক্ত ও ক্ষতিকর রাসায়নিকমুক্ত শাক-সবজি ও ফলমূল উৎপাদন করা সম্ভব। এর আরো একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো রাসায়নিক কীটনাশক পরিবর্তে জৈব কীটনাশকের ব্যবহার যা একইসাথে পরিবেশের জন্য ভালো এবং নিরাপদ। এতে একই জায়গায় অনেক ফসল ফলানো যায় এবং সবচেয়ে বড় সুবিধা এতে পানির অপচয় কম হয় ও উৎপাদন ভাল হয়। উদাহরণ স্বরূপ যদি একই অ্যাকুয়াপনিক্সে লেটুস ও মাছ চাষ করা হয় তাহলে প্রতি বছর ৬-৮ টন মাছ এবং ৪৫,০০০ লেটুস পাতা উৎপাদন করা সম্ভব।

কোনো প্রকার মাটির ব্যবহার ছাড়াই এ পদ্ধতিতে মাছ, শাকসবজি, ফলমূল ও ভেষজ উদ্ভিদের চাষ করা যাবে। বসতবাড়ির ছাদে বা আঙ্গিনায় সুবিধামতো আয়তনের সাধারণ প্লাস্টিক ট্যাংক, ড্রাম বা ব্যারেলে অল্প পুঁজিতেই এই প্রকল্প শুরু করতে পারেন। ড্রামের বা ট্যাংকের মধ্যে পানি পূর্ণ করে সেখানে শিং, মাগুর, তেলাপিয়া, কই, পাবদা, চিংড়ী সহ বিভিন্ন দেশীয় জাতের মাছ চাষ করতে পারেন। আর এর সাথে সমন্বিতভাবে সবজি চাষ করতে হলে একটি আলনা আকৃতির কাঠামো তৈরী করে তাতে তিন সারিতে উল্টো করে একটির নিচে আরেকটি দুই পাশে কাটা প্লাস্টিকের বোতল বসিয়ে তাতে নুড়ি পাথর দিয়ে সবজির চারা লাগাতে হবে। এবার মাছের ট্যাংকের পানি বালতি করে উপরে তুলে সেখান থেকে সাইফোনিক প্রক্রিয়ায় ফোঁটা ফোঁটা করে গাছের চারাতে সরবরাহ করা হয়। এই পানি পর্যায়ক্রমে উপর থেকে নিচে আবার মাছের ট্যাংকে ব্যবহার করা হয়। চাইলে স্বল্প ওয়াটের মোটরও ব্যবহার করতে পারেন পানি চক্রাকারে ব্যবহার করার জন্য।

মাছের নিঃসৃত রেচন পদার্থ হলো অ্যামোনিয়া সমৃদ্ধ, অর্থাৎ নাইট্রোজেন যুক্ত। গাছের শিকড়ে অবস্থিত ডি-নাইট্রিফাইং ব্যাকটেরিয়া উক্ত নিঃসৃত পদার্থকে ভেঙ্গে নাইট্রেটে পরিণত করে যা গাছে পুষ্টি সরবরাহ করে। তাছাড়া মাছের নিঃসৃত রেচন পদার্থে এমন অনেক পদার্থ আছে যা গাছের পুষ্টি সরবরাহ করতে পারে। এভাবে পানি দূষণমুক্ত হয়ে পুনরায় মাছের ট্যাংকে ফিরে আসে। এর ফলে একই পানি দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায় ও পানি পরিবর্তনের ঝামেলাও পোহাতে হয় না।

এ পদ্ধতিতে প্রধানত শসা, টমেটো, করোলা, শিম, বেগুন, পুদিনা, কলমী, মরিচ, লেটুস, স্ট্রবেরি, আঙ্গুর ও বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদ যেমন থানকুনি বেশ ভালো হয়।

26/01/2019

0 responses on "অ্যাকুয়াপনিক্সঃ একটি মাটিবিহীন মাছ ও সবজি চাষ ব্যবস্থা"

Leave a Message

Your email address will not be published. Required fields are marked *

top
PathGhor © 2019. All rights reserved.
X